Pain Of Love
Saint Mary’s Hospital : 11 PM ইতালির মিলান শহরের একটা হাসপাতালের নিস্তব্ধ করিডরে বসে আছে এক মেয়ে। হসপিটালের এই হালকা ওষুধের গন্ধ আর চারপাশে শুধু হুইলচেয়ারের শব্দ আর মেশিনের বিপ-বিপ ধ্বনি যা তার বুকের ভেতর কাঁপুনি ধরাচ্ছিলো। তার চোখ লাল হয়ে উঠেছে অশ্রুতে, কিন্তু সে কোনোভাবেই ভেঙে পড়তে পারছে না কারণ এই মুহূর্তে সে ভেঙে পড়লে তার ছোট্ট বোনকে যে হারাতে হবে। বিছানায় শুয়ে আছে বছর পনেরো এর এক কিশোরী। দীর্ঘ দিন অসুস্থতায় তার ফর্সা মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে ঠোঁট শুকিয়ে গেছে। নাকে অক্সিজেন টিউব ও শরীরজুড়ে তার জটলা এমন পরিস্থিতিতে সে জীবনের প্রতিটি শ্বাসে লড়ছে। মেয়েটি এগিয়ে গিয়ে বোনের কপালে হাত রাখলো। তার কণ্ঠ কাঁপছিলো কিন্তু সে জোর করে হাসি ফুটিয়ে বলল, ~ "শাফি… আমি আছি না? ভয় পাবি না। আপু তোকে কিছু হতে দিবে নাহ।" শাফায়েত দুর্বল কণ্ঠে মৃদু হাসলো, ~ "আপু… তুমি কাঁদছো কেন? আমি তো ভালো হয়ে যাবো… তাই না?" এই কথাগুলো পাশে বসা মেয়েটির হৃদয়ে তীরের মতো বিঁধলো। চোখের পানি গড়িয়ে পড়ার আগেই সে দ্রুত মুখ ফিরিয়ে নিলো। তাকে দুর্বল হওয়া চলবে নাহ তাহলে যে শাফায়েত ও হার মেনে নিবে। বোনের কপালে একটা স্নেহের চুম্বন দিয়ে সে কেবিন থেকে বের হয়ে যায় ডক্টররের খুঁজে। ডাক্তারের দিকে ছুটে গিয়ে দু’হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে পড়লো। ~ "ডাক্তার সাহেব, কিছু একটা করুন না! আমি যেভাবেই হোক টাকা জোগাড় করব… আপনার যা চাই সব দেব… শুধু আমার বোনটাকে বাঁচান। প্লিজ!" ডা.হেমলক তখন চশমার আড়াল থেকে ক্লান্ত চোখে তাকালেন মেয়েটির দিকে। কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর নিচু গলায় মেয়েটিকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ~ "আমি দুঃখিত, মেহরিশ। এখন আর সাধারণ চিকিৎসা কাজ করবে না। শাফায়েত এর শরীরের কোষগুলো ধ্বংস হচ্ছে Crimson Veil Syndrome এর কারণে। আর এখন সেটা শুধুমাত্র এক ধরনের রেয়ার এক্সপেরিমেন্টাল সিরাম ই তাকে বাঁচাতে পারে এখন।" ~ "কোন সিরাম ? কোথায় পাওয়া যাবে এটি? বলুন নাহ প্লিজ....আমি আজই নিয়ে আসব!" ( মেহরিশ কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করে) ~ "মেহরিশ তুমি নিজে ও জানো ওটা সাধারণ বাজারে নেই। আর এটা মার্কেটে আসতে এখন ও অনেক সময় লাগবে। এখন খুব সীমিত হাতে আছে… আর তা কেবল শহরে একজন মানুষের কাছেই.....!" মেহরিশের শ্বাস আটকে গেল। নামটা তিনি উচ্চারণ না করলেও বুঝতে এক সেকেন্ডও লাগলো না তার। সেই নাম যা যা মিলান শহরের প্রতিটি অলি-গলিতে আতঙ্কের প্রতীক হিসাবে চিহ্নিত মাফিয়া কিং সাইরান ফারিস। ~ "মেহরিশ তুমি জানো ওষুধটা কে কন্ট্রোল করছে। আমি বেশি কিছু বলতে পারব না।" (ডাক্তার হেমলক তখন দ্বিধার সাথে বললেন) মুহূর্তে মেহরিশের চোখে এক ঝলক দৃঢ়তা ফুটে উঠলো। অশ্রু মুছে সে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। ~ "আমি জানি। আর জানি তার কাছে যাওয়া মানেই বিপদ। তবু আমি যাবো। কারণ শাফি আমার পৃথিবী… আমার সবকিছু।" তারপর আবার কেবিনে ফিরে এসে শাফায়াতের বিছানার পাশে বসে পরে। কড়া ডোজের ঔষধের কারণে শাফায়াত তখন গভীর ঘুমে মগ্ন। বোনের হাত শক্ত করে ধরে দৃঢ় কন্ঠে মেহরিশ বললো, ~ "তুই চিন্তা করিস না শাফি… আমি তোকে কিছুতেই একা ফেলে যাবো না। আমি যেকোনোভাবে ওষুধ নিয়ে ফিরব। তার জন্য যদি আমাকে আবার ও সাইরান ফারিসের কাছে যেতে হয় তাও আমি যাবো।" ••••••••••••••• রাত তখন বারোটা ছুঁইছুঁই। শহরের মাঝখানে পুরনো এক প্রাসাদসদৃশ ম্যানশন যেখানে ঢুকলেই বোঝা যায় এ জায়গাটা কারো সাধারণ বাসভবন নয়। উঁচু লোহার গেটের দুই পাশে দাঁড়িয়ে আছে কালো স্যুট-পরা দেহরক্ষীরা, তাদের হাতে চকচকে বন্দুক, চোখে কালো শেডস এমনহ অন্ধকার রাতে ও। ভিতরে ঢোকার প্রতিটি সিঁড়ি যেন কংক্রিট নয় মানুষের ভয় দিয়ে তৈরি। ম্যানশনের ভিতরে বিলাসবহুল হলরুম। অন্ধকারে ভাসছে ধোঁয়া আর হুইস্কির গন্ধ। ভারী কাঠের টেবিলের মাথায় বসে আছে এক ব্যক্তি যার পরনে কালো শার্ট, হাতার বোতাম খোলা। তার পুরো গেটআপ দেখলেই রাজকীয় ভাব অনুভব হবে। পায়ের উপর এক পা তুলে বসে আছে। এক হাত দিয়ে সিগারেট ফুঁকতেছে আর অন্য হাতে একটা রিভলবার রাখা যা ক্রমাগত হাত দিয়ে নাড়িয়ে চলতেছে সে। তার চারপাশে ৬-৭ জন লোক নিঃশব্দে মাথা নিচু করে দাড়িয়ে আছে কারও সাহস নেই সাইরানের চোখে চোখ রাখার। সে-ই সাইরান ফারিস। মিলানের অঘোষিত রাজা। যাকে কেউ বলে দানব তো কেউ বলে অভিশাপ। কিন্তু সবাই জানে তার সাথে শত্রুতা মানে মৃত্যুর পথে হাঁটা। টেবিলের পাশে একজন ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে দাঁড়িয়েছিল। সিগারেটে এক টান দিয়ে সাইরান কেবল আঙুলের এক ইশারা করলো। সঙ্গে সঙ্গেই দুইজন গার্ড লোকটাকে টেনে সাইরানের পায়ের নিচে হাঁটু গেড়ে বসিয়ে দেয়। ~ "কিং সাইরান দয়া করে আমাকে ছেড়ে দিন,আমি কিছু জানি নাহ ভিডিও টা কিভাবে ওদের হাতে পড়েছে। দয়া করে আমাকে মারবেন নাহ। আমার ছোট ছোট ২ টা বাচ্চা আছে ওদের কে অনাত করে দিবেন নাহ।" (লোকটা হাত জোড় করে কান্না করতে করতে বলে।) কিন্ত সাইরান লোকটির কথায় কোনো তোয়াক্কা না করেই সেকেন্ডখানেক পরেই ভেসে এলো বন্দুকের শব্দ। লোকটির ঠিক কপাল বরাবর তার প্রিয় বন্ধুকটির কয়েকটা গুলি ছুড়ে দেয়। চারপাশে নিস্তব্ধতায় তখন লোকটির আর্থনাদ আর বন্ধুকের আওয়াজে আরও গাঢ় হলো। সাইরান শান্তভাবে আবার ও সিগারেট ঠোঁটে নিয়ে বললো, ~ "দ্রোহের মূল্য সবসময় রক্ত দিয়েই চুকাতে হয়।" তারপর গার্ডদের কে নির্দেশ দেয় এই আবর্জনা কে সরিয়ে জায়গায় টা ক্লিন কর রাখতে। বলেই আবার ও সিগারেট টান দিতে দিতে উপরের দিকে চলে যায়। তাকে এখন শাওয়ার নিতে হবে নোংরা রক্ত শরীরে লেগে আছে। •••••••••••••••••••••• সকালে মেহরিশ বোনের হাত ধরে বসে আছে। শাফায়েত গভীর ঘুমে অথচ মেহরিশের মন একটুখানি ও শান্ত নয়। মনটা একটু ফ্রেশ করতে সে কেবিনের বাহিরে বের হয়। হঠাৎ করিডোরে কিছু মানুষের জটলা দেখে ওই দিকে এগিয়ে যায় সে। তখন চোখে পরে সামনের বড় টিভির স্ক্রিনে লাল "BREAKING NEWS " ট্যাগ ঝলমল করে উঠলো। ব্রেকিং নিউজ আজ মিলান শহরের কেন্দ্র থেকে আবারও এক খুনের ঘটনা। বিশিষ্ট জার্নালিস্ট হেনরি এর লাশ খুঁজে পাওয়া গেছে তারই বাড়িতে। হত্যাকারীর কোনো হদিস এখনও পাওয়া যায়নি। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন হত্যাকারী কোনো চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায় নাই। কিন্তু তদন্ত কমিটি শিগ্রহী সব কিছু জানাবে। হত্যাকারীর অনুসন্ধান জানতে পর্দায় চোখ রাখুন। মেহরিশ টিভির দিকে তাকিয়ে রইল। বুকের ভেতর কেন যেন অদ্ভুত কাঁপুনির সৃষ্টি হলো নিউজ টা দেখে। ব্রেকিং নিউজে বলা হয়েছে যে, হত্যাকারীর কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি, কিন্তু মেহরিশ জানে, এই খুনের পেছনে যে হাত রয়েছে সেটা সাইরান ফারিসের গ্যাং-এরই। হঠাৎ মনের মধ্যে এক অদ্ভুত আতঙ্ক এবং দৃঢ় সংকল্প একসাথে ফুটে ওঠে। সে জানে শাফায়েতকে বাঁচানোর জন্য তার এখন সাইরানের কাছে পৌঁছানো ছাড়া কোনো উপায় নেই। কিন্তু শহরের মাঝখানে এত বিপদ, গ্যাং-এর রাজত্ব আর সাইরানের অপ্রত্যাশিত রূক্ষতা সবকিছু মিলিয়ে মেহরিশ ভেবে পাচ্ছে নাহ কি সিদ্ধান্ত নিবে। সে টেলিভিশন থেকে চোখ সরিয়ে এক গভীর নিঃশ্বাস নিলো। তারপর দ্রুত হসপিটালের বাইরে বেরিয়ে আসে। পকেট থেকে ফোন বের করে কাউকে কল দেয়। কিছুক্ষণ কথা বলার পর, সে পাশের ছোট্ট ক্যাফেতে ঢুকল এবং এক কোণায় বসে গেল। প্রায় বিশ মিনিটের অপেক্ষার পর ক্যাফের দরজা খোলার শব্দ শুনে মেহরিশ একটু সজাগ হয়ে উঠল। দরজা দিয়ে তখন এক ছেলে ঢুকে আর সে সরাসরি মেহরিশের সামনের চেয়ারে বসে পরে। ~ "হোয়াট হ্যাপেন্ড? এতো তাড়াতাড়ি আসতে বললি!"ছেলেটি চেয়ার বয়ে বসতে বসতে জিজ্ঞেস করল। তার কণ্ঠে সামান্য কৌতূহল। মেহরিশ দ্রুত ফোন ব্যাগে রেখে হাত মেলাল ছেলেটির সাথে। ~ "লিয়ান… আমি তোমার সাহায্য চাই। এটা একমাত্র তোমার মাধ্যমে সম্ভব। প্লিজ, আমাকে সাহায্য করো।" লিয়ান কফি অর্ডার দিতে দিতে নাটকীয়ভাবে তাকিয়ে বলল, ~ "ওকে ওকে… ঠিক আছে। কিন্তু এত রিকুয়েস্ট করে বলছ কেন? তোর জন্য কি মনে হয় আমি সাহায্য করব না? …হাহ, আমি তো ভাত ঘুম থেকে উঠে এখানে আসছি শুধু মাত্র তর জন্য।" - বেশ ভাব নিয়ে লিয়ান বলে উঠে। মেহরিশ তৎপর হয়ে বলল, ~ "আই ওয়ান্ট টু নো সাইরান ফারিস এড্রেস। তাকে কোথায় পাওয়া যাবে, কখন পাওয়া যাবে, এভরিথিং… আমি জানতে চাই।" ক্রমশ...! বিঃদ্রঃ: গল্পে প্রকাশিত স্থান, সময়, ঘটনা, চরিত্র এবং রোগের নাম সবই কল্পনাত্মক। বাস্তবের সাথে এদের কোনো মিল নেই। পাঠকগণ এটি বাস্তবতার সাথে মিলাবেন না।

